অপরিচিতা

গল্প




অপরিচিতা

-শাহীনুর ইসলাম




আমার বাসা থেকে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পুরো এক ঘন্টা লাগে। বাস বদল করতে হয় যাওয়ার সময় দুইটা, আর আসার সময় তিনটা।

এজন্য রুটি-রোজগারের দিন সাধারণত অন্য কোনো কাজ রাখি না আমি। তাছাড়া খুবই অলস মানুষ আমি। আর আলস্যকে যে কোনো কিছুর চেয়ে উপভোগ করি সবচেয়ে বেশি। এর সমতুল্য উপভোগ্য আর কিছু পাই না। এজন্য কেউ কেউ আমাকে ভাগ্যবান বলেও অভিহিত করেন। তবে সব দিন যে এমন যায় তা তো নয়। যেদিন নিয়মিত কাজের সাথে অন্য কোনো কাজ করতে হয় সেদিনটা খুবই বিরক্ত ও ক্লান্ত লাগে। আজকের দিনটাও তেমনই একটা দিন। অনভ্যাসবশত সেই সকালে ঘুম থেকে উঠে আলগা কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজটি শেষ করতে হল।

কাজটা শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। আধা ঘন্টা বিশ্রামও নেই পরের একটানা আট ঘন্টা কাজটির কথা ভেবে। এ ভাবনাটাও ক্লান্তি ও বিরক্তিকে যেন বাড়িয়ে দেয়।

দুটো বাজলে প্রতিদিনের মতো আজকেও কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। বাইরে বেরোতেই এ বছরে প্রথম বারের মতো শরতের হিমেল ধাক্কা প্রাণে শিহরণ জাগিয়ে যায়। মনে হয় রোদ এবং হিম দুজনে বাসর লগন কাটাচ্ছে। খুব ঠাণ্ডাও নয়, আবার খুব গরমও নয়। ঠিক করি প্রথম বাসটা না ধরে হেঁটেই যাব। তিন মিনিটের জায়গায় না হয় দশ মিনিট লাগবে। কিন্তু এতে তো শরতের প্রথম অনুভবকে সর্বাঙ্গে মাখা যাবে। তাছাড়া মানুষের জীবন আর কদিনের? এরই মধ্যে যা করার করতে হবে, যা দেখার দেখতে হবে। দৃশ্য, শ্রুতি, স্পর্শ, গন্ধ রসে কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে তুলতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে শরতের পাতাগুলোকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছি। এখনো যদিও পাকা রঙে সাজেনি, তবে প্রতিদিনের সাথে পাল্লা দিয়ে এরা নিজেদের রঙ পাকা করে ফেলবে। পাকা করতে করতে শেষবারের মতো সাজবে মনের উষ্ণ রঙে ঠিক ঝরে পড়ার আগে। এতে মাত্র দেড়মাস লাগবে। তখন দেখার মতো কমলা, হলুদ, লাল রঙের সাজে সজ্জিত হবে। এ সময়টা জুড়ে এ রকম মনোলোভা সাজ দেখিয়ে দীর্ঘ শীতকালকে যেন কাঁচকলা দেখাবে বৃক্ষরাজি।

কিন্তু বাতাসে ভেসে আসা হিমেল অনুভবটা আসলে আসন্ন কনকনে শীত-জাগানিয়া অনুভবেরই কোমল রূপ। আগাম সেই ভাবনা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। আজকে রোদ তার বিগত তিন মাসের প্রাখর্য হারিয়ে ফেলায় একটু নরম হয়েছে। ভালই লাগছে রোদটাকে। মূলত এ কারণে হার্ডম্যান বাস স্টেশনে হেঁটে হেঁটে যাব বলে বের হয়েছি আজ।

পৌঁছামাত্র স্টেশনটিকে আগের তুলনায় অন্য রকম মনে হয়। সেটা কি স্থানান্তরের কারণে? বোধ হয়! অথবা তার চেয়ে বড় কারণ আগের স্টেশনের তুলনায় এর শক্ত, নিরাপদ ছাউনিখানি নেই বলে।

অটোয়ার বড় স্টেশন হওয়ায় এখানে অনেক বাসের ট্রানজিট। যাত্রীদেরও ভিড় কম বেশি লেগেই থাকে। সম্প্রতি স্থানান্তরিত হয়েছে নির্মাণ কাজের জন্য। তাই সময়সূচী, ট্টানজিট, ওঠা-নামার স্থান সম্পর্কে যাত্রীদের এখনো বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে ছোট-খাটো একটা হাশরের ময়দান!

আমার কাজে পৌঁছে দেওয়ার বাসটার জন্য অপেক্ষা করি। ইদানীং ভিড়টা বেশি বেড়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর বাসটি চলে আসে। আজো লোকজনকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে লক্ষ করি। আমার যাওয়ার সময়েই সব মানুষের যাওয়ার সময় হয় বুঝি! ভিড় ঠেলে বাসের পিছন দরজা দিয়ে উঠে পড়ি। বসার কোনো আসন ফাঁকা নেই। অগত্যে দাঁড়িয়ে থাকি উপরের হাতল ধরে। আমার মতো আরো বেশ কয়েক জন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে।

বাস আবার চলতে শুরু করে। আমার একটু পিছন থেকে নারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। এক নজর তাকিয়ে দেখি সে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে। বাম হাত দিয়ে কানে ফোনটা ধরেছে, আর ডান হাত দিয়ে বাসের লম্বা খুঁটিটা ধরে রেখেছে। তবে ডান হাতটার ভেতর হাত ব্যাগের খিলানাকৃতির ফিতাটা ঢোকানো।



এক নজর দেখে তার যে ছবিখানি মানসপটে ছাপ রেখে যায় তাতে সে অনেকটা এ রকম: নাকটি টিকালো, মুখাকৃতি লম্বাটে এবং শ্যামা রঙের, চোখের মনি কালো, চুলও কালো। মাথা থেকে কপাল পর্যন্ত হিজাব পরার মতো করে ঢাকা। মুখে এক ধরণের মায়াবী আকর্ষণও আছে। সব মিলিয়ে একবার মনে হল সে বাঙ্গালি হবে। কিন্তু সে ফোনে নিচু স্বরে অস্পষ্ট ভাষায় যে কথা বলছে তা ঠিক বাংলার মতো লাগছে না। ভাষা শুনে মধ্যপ্রাচ্যের মানবী বলে স্থির ধারণায় পৌঁছাই। তার বলার ভাষাটা ইংরেজিও নয়। হয়তো অন্য কোনো ভাষা বলছে যার সাথে আমার পরিচয় নেই। তাই সে যে বাঙালি নয় এতে সে ধারণা আরো পাকাপোক্ত হয়ে যায়।

দশ মিনিট পর আমার বাম পাশের একটি আসন থেকে একজন যাত্রী পরের এক স্টেশনে নেমে যায়। আমি কাছাকাছি থাকায় আমার অগ্রাধিকার। তাছাড়া সুস্থ-সবল মেয়েদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা নেই এখানে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যারা অচল, যাদের বিশেষ প্রতিবন্ধকতা আছে তাদের জন্যই কেবল এ ব্যবস্থা। আর আমি বললেই যে একটা মেয়ে আমার ছেড়ে দেওয়া আসনে গিয়ে বসবে তা সাধারণত ঘটে না। তাই আমি ফাঁকা আসনটায় গিয়ে বসি।

মেয়েটি তখনো কানে ফোন গুঁজে রেখে কথা বলছে। পরের স্টপে আমার পাশের জন নেমে যায়। আর কাছাকাছি থাকায় সে আমার পাশের ফাঁকা আসনটিতে বসার জন্য দু’পা বাড়ায়। আমি তখন কোণার আসনে চেপে বসি। বসার সময় চকিত এক চাহনিতে আমাকে মেপে নিল মনে হয়। তখনো সে কথা বলেই যাচ্ছে। আর থেকে থেকে মৃদু হাসি দিচ্ছে।

তার কথা শোনার জন্য আমি যে কান পেতে আছি তা কিন্তু নয়। বরং যথাসম্ভব বাসের ভেতরটাকে এবং বাইরের প্রকৃতিকে অনিয়মিত বিরতিতে দেখে যাচ্ছি। ভেতরে তো আছে নানা বয়সী, নানা বর্ণ ও গোত্রের মানুষ; আর বাইরের পত্রপুঞ্জে দেখা যাচ্ছে কচি শরতের চিত্রিত বিবিধ বর্ণবাহার।

সে কিছুটা আস্তে কথা বলছে। আর বাসের আওয়াজ এবং যাত্রীদের হালকা কিচিরমিচিরের মধ্যে তার কথা আমার কানে স্পষ্টরূপে ধরা দিচ্ছে না।

ফোনে কথা বলতে বলতে তার সবিরাম হাসিটা মুহূর্তে মুহূর্তে যেন বদল হচ্ছে এখানকার শরৎ ঋতুর মতো। তার কথা বুঝতে পারছি না ঠিকই। কিন্তু তার হাসির ভাষাটা আমার কাছে যেন অনেকটা চেনা লাগছে।

তার কথা যেহেতু স্পষ্টভাবে শুনতে ও বুঝতে পারছি না, সেহেতু আমার মনোযোগ আপনাআপনি শরতের কচি রূপ লাবণ্যের দিকে চলে যায়। বাসের চলার সাথে সাথে শরতের রূপও গতি পেয়েছে যেন। এ ঋতুর ভাণ্ডারে যত রঙ আছে জানালায় সেসব রঙের কিছু কিছু স্লাইড শো হচ্ছে। এখনো গড়পড়তা রঙটা সবুজ থাকলেও পাতার কোণায় কোণায় উজ্জ্বল, উষ্ণ রঙকে নাচতে দেখা যাচ্ছে। আর যদিও মাঝে মাঝে ছোট-বড় ব্রিজ, দালান-কোঠা, রূপসী শরতের সেই প্রদর্শনীতে এসে অনুপ্রবেশ করছে, তবু গতিময়তা থাকার দরুন ভালই লাগছে।

কিছুক্ষণ পর আবার সে আমার মনোযোগ কেড়ে নেয়। তবে এবার সরাসরি আমার কানে আওয়াজ লাগিয়ে দিয়ে। মাথাটা তার দিকে ঘুরাতেই দেখি সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে,

-ইক্সকিউজ মি। ডু ইউ নৌ হাউ আই ক্যান গেট হোথর্ন এন্ড হান্ট ক্লাব ইন্টারসেকশন?

ফিরে দেখি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে হাতের মুঠোয় রেখে দিয়েছে সে। প্রাণবন্তভাবে উত্তর করি,

– নৌ ওয়ারিজ। দিস বাস উইল টেইক ইউ দেয়ার।

তার উচ্চারণ শুনে আমার মতোই অভিবাসী বলে মনে হল। নির্ধারিত স্টপে স্টপে থেমে বাসটি যাত্রী নামাচ্ছে ও তুলছে। চোখ-মুখ দেখে কিছুটা অস্থির অস্থির লাগছে তাকে। আমাকে আবার প্রশ্ন করে,

-হাউ লং উইল ইট টেইক টু গৌ দেয়ার?

এ রাস্তা দিয়ে কয়েক বছর ধরে সপ্তাহে পাঁচ দিন আমি নিয়মিত চলাচল করি। তাই কোনটার পর কোনটা বাস স্টপ তা প্রায় মুখস্থ। কিন্তু সে যেখানে যেতে চাইছে এ বাসের গন্তব্য সেখানেই। জবাবে বলি,

-নট সৌ ক্লোজ দৌ। ইট উইল টেইক ইউ হাফ অ্যান আওয়ার।

এরপর এক চিলতে হাসি দিয়ে তাকে আরো বলি,

-দ্য ড্রাইভার উইল টেল ইউ টু গেট অফ ইফ ইউ ফরগেট।

-হাউ উইল শী নৌ আই’ল গেট অফ দেয়ার?

 -বিকজ দ্যাট’স দী লাস্টপ। অন টপ অব দ্যাট, আই ক্যান রিমাইন্ড ইউ।

-আর ইউ অলসৌ গৌয়িং দেয়ার?

-রাইট। আই’ম অলসৌ গৌয়িং দেয়ার।

আমার উত্তর শুনে তার চোখে মুখে নিশ্চয়তার আভা খেলে যায়। এ পথে যে সে আগে পা বাড়ায়নি সেটা স্পষ্ট বোঝা গেল। ভাব দেখেও মনে হচ্ছে এ দেশে বেশি দিন হয়নি।



আবার ফোনটা সে কানে তুলে নেয়। মনে হয় একই ব্যক্তির সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। এমন অপরিচিতার সাথে ইচ্ছে করলেই কিছু বিষয় নিয়ে কথা তোলা যায়। এখানকার লোকজন অপরিচিতের সাথে কথা আরম্ভ করতে সাধারণত যা করে আর কী। যেমন—আবহাওয়া, শরৎ ঋতু ইত্যাদি সাধারণ বিষয়ে।

আমিও তেমনটা করতে পারতাম। তারপর সেখান থেকে আলাপ করতে করতে এক সময় দুজনার পছন্দের বিষয়ে যেতে পারতাম। আর তা নিয়ে বকবক করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম দুজনই। এরপর কিছু ঘটলে ঘটল। আর না ঘটলে নাই। কিন্তু কে না জানে সবাইকে দিয়ে সব হয় না। তাছাড়া সে তো ফোনে কথা বলেই যাচ্ছে আরেক জনের সাথে। এক্ষেত্রে তার সাথে নতুন কথা বলার সুযোগ কোথায়? অথবা দরকারটাই-বা কী?

সে যদি ফোনটা তার কানে গুঁজে রেডিও স্টেশনের মতো অনর্গল কথা না বলত, তবে হয়ত কথা বলার একটা সুযোগ মিলতে পারত। এর মাধ্যমে তার নিজ দেশের সংস্কৃতি, আচারবৈশিষ্ট্যের কিছু হয়ত জানা যেতে পারত। নয়ত তার এখানকার জীবনের অভিজ্ঞতা শোনা যেতে পারত। জানা যেতে পারত অনেক কিছুই অথবা কিছুই না। শুধু বকবক করা হত।

এরপর সে আমাকে আর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেনি। আরো পনের মিনিট পর বাসটার ভিড় কমে যায়। এখন কেউ আর দাঁড়িয়ে নেই। বরং কিছু আসন ফাঁকা থাকতে দেখা যাচ্ছে। এরপরে যখনই একটা করে স্টপ আসে, তখনই কিছু যাত্রীকে নামতে দেখা যায়। নামে যত লোক ওঠে তত কম। শেষ জায়গাটায় যেতে যেতে বেশিরভাগ দিনেই তো যাত্রী বলতে থাকি শুধু আমি।

বাসের যাত্রী কমার সাথে সাথে মেয়েটি এক সময় আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে আমার সামনের ফাঁকা দুটো আসনে আরাম করে বসে। এখন তার হাসি যেন একটু একটু করে বাড়তে থাকে। সেই হাসিতে জড়িয়ে থাকে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া পশ্চিমাকাশের ঝিলমিলে মেঘের রঙ। এহেক সময় তার হাসি এহেক রঙ ছড়ায়। এতক্ষণের আড়ষ্টতা এখন যেন লাগামছাড়া হয়েছে। মুক্ত পাখির মতো উড়ে উড়ে আকাশপথে কল্পিত রেখা আঁকছে। যে রেখাগুলো আমাকে বড় বিভ্রান্ত করে তুলছে। আমি রেখাগুলোর অর্থোদ্ধার করতে চেষ্টা করি। সেটা করতে গিয়ে রীতিমতো ঘাম ঝরে আমার। চেষ্টা শেষে নিজেকে ব্যর্থ একজন আবিস্কারক বই অন্য কিছু মনে হয় না। কেউ বলছে না। তবে আমার ভাবনারা তা-ই বলে। হাসির রেখাগুলোতে মনে হয় কী যেন লুকাচ্ছে। মনে হয় তার হাসিকে যদি স্থিরচিত্রে আনা যায়, তবে সে হাসির একেকটা সুদীর্ঘ, বাঁকা রেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে নানা রঙ, নানা অনুভব ও নানা অর্থ।

ভাব গোপন করতে হাসে, সত্য লুকাতে হাসে, ছলনা করেও হাসে মনে হল। তার হাসির সব ঝাঁপি খুলে আপন মনে বিশ্লেষণ করে একজনের সাথে মিল পাই। সেটা হল সেলসগার্লের হাসি।

সেলসগার্ল সব ক্ষেত্রে হাসে। তার পেশাটাই এমন। না হাসলে তার চাকুরীটা থাকবে না। তাই সে প্রতারণা করে হাসে, প্রতারিত হয়েও হাসে, দুঃখ ঢাকতে হাসে, কান্না লুকাতেও হাসে। আর আনন্দে থাকলে তো হাসেই। তবে সেলসগার্লের সব হাসির উদ্দেশ্য প্রায় একই থাকে—সন্তুষ্ট করার হাসি। নিজে সন্তুষ্ট না থাকলেও এ হাসি তাকে হাসতে হয়।

কিন্তু মেয়েটার হাসি সেলসগার্লের হাসির চেয়েও অনেক বৈচিত্র্যের অধিকারী। হাসিই যেন তার একমাত্র ভাষাভঙ্গি। এতে আমার কিছু সুবিধাই হয়েছে। তাকে যেন কিছুটা পড়তে পারছি তার হাসির মধ্য দিয়ে। আমার পঠনে ছেদ ঘটে যখন আবার দেখি ফোনালাপ করতে করতে তার হাসিটা এক সময় উবে যায়, যদিও কথা বলেই যায়।

গন্তব্যে যেতে আরো পনের মিনিট লাগবে। তার হাসিটা থেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আমার একটু ঝিমুনি আসে। হয়ত-বা খুব সকালে ওঠার জন্য আমার ক্লান্তি আমাকে দ্রুত তন্দ্রার ঘোরে নিয়ে যায়। মেয়েটি যদি পাশে না থাকত, তাহলে নিশ্চিত অনেক আগেই আমি এ ঘোরে চলে যেতাম।

সে তার জায়গায় একই তালে বকবক করেই যাচ্ছে। তার স্বর আবহসঙ্গীতের মতো আমাকে আরো তন্দ্রাচ্ছন্ন করে। আর বাস চলার তন্দ্রা আনানো একটা দোলা তো আছেই। তাছাড়া প্রায় প্রতি রাতে আস্তে করে গান শুনে শুনে আমার ঘুম আসে। এ অভ্যাসটাই আবার জেগে উঠেছে বলে মনে হল।

এখানকার বাসে অযথা ভেঁপু বাজে না। বাসের আওয়াজ বলতে যান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্টপে স্টপে জায়গার নাম ধরে একটু জোরে বলে সবার সুবিধার্থে। তা বলারও একটা ছন্দ আছে। তন্দ্রায় খুব একটা ব্যাঘাত ঘটায় না।

সুখে থাকলে সময় যেমন দ্রুত চলে যায়, ঘুমে থাকলেও তেমনই হয়। তাই পনের মিনিট সময় যেন চোখের নিমিষে চলে যায়। আমার চোখ বোঁজা অবস্থায় শুনতে পাই ড্রাইভার জোরে জোরে চেঁচাচ্ছে,

-হ্যালো! হ্যালো স্যার! দিস ইজ দী লাস্ট স্টপ।



একটা ঝাঁকি দিয়ে চোখ খুলতেই দেখি বাসটা থেমে আছে। পনের মিনিট আগে চোখ যে বন্ধ করি আর এখন খুলি—এটা যেন আমার কাছে এক সেকেন্ডের ঘটনা। পুরো বাসে ড্রাইভার আর আমি ছাড়া কেউ নেই। মেয়েটিও নেমে গেছে। আমাকেও নামতে হবে। নামতেই চেনা ধরণের একটা কথা কানে ভেসে আসে। সঙ্গে সঙ্গে এর উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখি বাসের সেই মেয়েটি রাস্তা পার হচ্ছে। আমি বিস্মিত না হয়ে পারি না। যাত্রার পুরোটা সময়জুড়ে মেয়েটি সম্পর্কে আমার যে হিসাব-নিকাশ ও ধারণা তা নিমিষে যেন মিথ্যে প্রমাণিত হল যখন দশ মিটার দূরত্বে তার মুখে আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চারিত ‘আমি রাকি, বাসার কান্দাত আইইছি’ বাক্যটি শুনি।

রাস্তায় গাড়ির শব্দের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে সে হয়ত এখন জোরে কথা বলছে। বাসে থাকতে যদি সে একটু জোরে কথা বলত! এখন তাকে ডেকে কথা বলার আর সুযোগ নেই। কারণ সে রাস্তা পার হচ্ছে অনির্ধারিত ক্রসিং দিয়ে। এমন সময় পিছু ডাকলে যে কোনো অঘটন ঘটতেও পারে। তাছাড়া আমার কাজে হাজিরা দেওয়ারও কাঁটায় কাঁটায় সময় হয়ে এসেছে।


*অপরিচিতা*




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*