মন কী যে চায়

গল্প




মন কী যে চায়

শাহীনুর ইসলাম


সে জানে তার ভাল লাগে। তার মানে ইলোরার। নির্ঘুম চন্দ্রালোকিত রাতে জানালার পাশে বসে থাকলে তাই কত ভাবনা খেলে যায় তার মনের মধ্যে! বসে বসে ভাবতে থাকে, এক জীবনে সব হয় না; সব জীবনও এক হয় না। দূর থেকে দেখলে আকাশের সব তারাকে একই মনে হয়। কিন্তু জোতির্বিদ মাত্রই জানেন কত ব্যবধান তাদের মধ্যে। সে ব্যবধান শুধু শারীরিক নয়, চরিত্রগতও। একইভাবে এক গাছের সব ফুলকেও একই মনে হয়; অনুবীক্ষণ যন্ত্রেই কেবল তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য হয়ত ধরা পড়ে। একই কণ্ঠে সকালে শোনা কোনো একটি গান বিকেল কিংবা রাতে একই রকম লাগে না। এ রকম হাজার হাজার উদাহরণ ধরাতলে ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে আছে। মানুষের বেলায় পেশাগত কারণে ইউনিফর্ম পরিয়ে ঐক্যের প্রতীক গড়া হয় এবং সেভাবেই ভাবতে শেখানো হয়। তবুও যেন তারা এক নয়। এমনকি প্রতিটি মুহূর্তের এই যে ‘আমি’ তাও অন্য কোনো মুহূর্তের সাথে হুবহু মেলে না। দূরত্বই সব কিছুকে এক করে রাখে; নৈকট্য সেই এক করে রাখাকে বহু করে। তবুও আমরা এক যখন ভাল থাকি, আর বহু যখন খারাপ থাকি। কারণ খারাপ থাকলেই সেই আনুবীক্ষণিক দৃষ্টি দিয়ে আমরা খারাপ থাকার কারণটাকে কেটে কুটে টুকরো টুকরো করে দেখি।

তবে খারাপ লাগার কারণ টুকরো টুকরো করে যত সহজে, যত বিস্তৃত করে সে ভাবতে পারে, বিশ্লেষণ করতে পারে, ভাল লাগার কারণ তত সহজে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কাছ থেকে ভাল লাগা নিয়ে হয়ত কিছুটা বলতে পারত সে, কিন্তু দূর থেকে ভাল লাগার কথা বর্ণনা করা বড়ই দুরূহ তার পক্ষে।

মাস যায়, বছর যায়, কিন্তু অস্ফুট কলির মতোই সে তার ভাল লাগার কথা অব্যক্ত রাখে। এমন নয় যে, তার সাহস নেই। সে শুধু একটা পরিসর খোঁজে ভাল লাগার মানুষটির কাছ থেকে। এমন পরিসর যেখানে সে কাছে থাকার আশ্বাস পাবে। কিন্তু বৃত্ত নির্মাণ করার মতো স্থির বিন্দু পায় না সে। আকারবিহীন বৃত্তে তাই তার মনটা ঘুরপাক খেতে থাকে।

এভাবে ঘুরপাক খেতে খেতে রঙিলা মেঘদলে নৃত্যরত সন্ধ্যার আকাশে যখন সে একদিন নিজের মনটাকে নাচাতে থাকে, তখন বৃত্তের বাইরে এসে সেই নৃত্যের নিক্কন হারানো সুর হয়ে তার মুঠোফোনে বাজে। এতে তার মগ্নতার আবেশ কেটে যায়। চেনা জায়গা, চেনা নদী, পুরানো সুর ও চেনা মানুষের সাথে যত পরেই দেখা হোক না কেন, হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে কিংবা তার সম্পর্কে কিছু শুনলে আপনা থেকেই যেন মনোযোগ সেদিকে চলে যায়। রিঙ টোনটা যতটা না তার ধ্যান ভেঙে ফেলে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভাঙে চেনা কণ্ঠস্বরটি। আগের মতোই ভরাট, গমগমে কণ্ঠ। আগেও সে এ কণ্ঠ শুনেছে। তবে দূর থেকে। আজকেও যদিও দূর থেকে শুনছে, তবু তা যেহেতু তাকেই উদ্দেশ্য করে, তাই এর তাৎপর্য্য ঢের বেশি। এ যেন পুকুরে ঢিল ছুঁড়তেই পুকুরের তরঙ্গ-উচ্ছ্বাসময় সাড়া।

অবশ্য হঠাৎ করেই সে যে এমন উষ্ণ সাড়া পেয়েছে তা কিন্তু নয়। এর জন্য নিজ থেকেই উদ্যোগ নিতে হয়েছে তাকে। নিজের বাসনাকে পরিপূর্ণ করতে কেই-বা আর এগিয়ে আসে? আপাতচক্ষে যদিও কাউকে আসতে দেখা যায়, তারও নিগূঢ় একটা স্বার্থ থাকার প্রমাণ মেলে। অবশ্য তাতেও তেমন সমস্যা নেই, যদি তাতে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা হয়। আর এজন্য তা পরস্পরের কাছেই কাম্য ও সানন্দে স্বাগতম হয়ে ওঠে।

মুঠোফোনটি বেজে ওঠার পেছনের গল্পটি হল— ইলোরাই সাহসী মেয়ের মতো প্রথমে নন্দনকে মুঠোফোন বার্তা পাঠায়। এরই উষ্ণ সাড়ায় মুঠোফোনের চেনা রিংটোনটি অচেনা এক সঙ্গীত মাধুর্যে বেজে ওঠে। এতদিন পর তার সাহস হল কোথা’ থেকে? কীভাবে? হয়ত এখন আর তার হারাবার কিছু নেই, কিংবা নেই প্রত্যাখানের কোনো অপমান বা ভয়। হয়ত আড়ষ্টতাও ভেঙে গেছে আরেক চেনা নদের স্রোতে। জিততে গিয়ে যে খেলায় নামে তার মধ্যে সংশয়, আস্থাহীনতা বা স্নায়ুকাতরতা থাকতে পারে। কিন্তু যে হারজিতের ধার ধারে না, সে সম্ভবত শুধু খেলার আনন্দটুকুর জন্যই খেলতে নামে।

একবার দু’বার রিং বাজার পর তৃতীয় বারের মাথায় সে কলটি গ্রহণ করে বাম কানে ধরে। ওপাশ থেকে ‘হ্যালো’, ‘হ্যালো’ বলার দশ সেকেন্ড পর সেও কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে ‘হ্যালো’ বলে। ওপাশ থেকে উত্তর আসে, ‘যে প্রথমে মুঠোবার্তা পাঠানোর সাহস রাখে তার ‘হ্যালো’ বলে জবাব দিতে এত সময় লাগে নাকি?’

এর উত্তরে কী বলা যায় ইলোরা ভেবে পায় না। হালকা নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার নীরব হয়ে যায়। ওপাশ থেকে ধৈর্যহারা হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আওয়াজ ভেসে আসে, ‘ঠিক আছে, রাখছি তাহলে’। তবু এপার থেকে কোনো কথা ওপারে পৌঁছায় না। যদিও এ পাশে নীরব কথার এলোপাথাড়ি তোলপাড়ে ইলোরার বুকের নদীর পার ভাঙছে। যে কথাটি ‘বলব বলব’ করে এতদিন বলা হয়নি, যে ফুলগুলো মালায় গাঁথা হয়েও গলায় পরানো হয়নি, তা এখনো হয়ত সম্ভব হবে না। অথচ সে ভেবেছে তার আর কোনো সঙ্কোচ নেই, দ্বিধা নেই। আরেক নদের স্রোতও তার আড়ষ্টতা পুরোপুরি কাটাতে পারেনি তাহলে। মুহূর্তকাল পরে সে নিজেকে আবার সাহসী করে তোলে। উত্তর দেয় প্রশ্ন করে, ‘এই প্রথম কথা বলছি না?’ কিন্তু ততক্ষণে সে বোঝে একটু দেরি হয়ে গেল। ওপাশটায় ফোন রেখে দিয়েছে।

ইলোরা এবার নিজেই ফোন করে। কয়েক বার রিং বাজার পর ওপাশ থেকে দায়সারা, ভাবলেশহীন গোছের ‘হ্যালো’ ধ্বনি শুনতে পায় সে। জবাবে ‘হ্যালো’ না বলে সে প্রশ্ন করে,

-ফোনটা রেখে দিলেন যে?

-ফোনে কথা না বললে ওটা কানে রেখে কী লাভ?

-কথা তো বলতেই গেছিলাম। একটু সময়ও দেবেন না?

-ঠিক আছে। এখন বলেন। নাচতে গিয়ে ঘোমটা!

-ঘোমটা যদি নাচে মুদ্রার কাজ করে, তবে তা না পরলে সঠিক ভাব প্রকাশ পাবে কী করে?

-তা কী ভাব শুনি।

-তাহলে তো আবার ঘোমটা পরতে হবে।

-না, পরার দরকার নেই। এমনই বলেন।

কিন্তু ইলোরা তার নিজ অন্তরে গুহাবাসী হয়েই থাকে। সেখানে এত দিনে রচিত দীর্ঘ হৃদয়-কাহন শোনাতে সে অপ্রস্তুত এখন। তাই মূল কথায় না গিয়ে কুশলাদি, ভাল লাগার পরিধি ও ব্যাসার্ধ, পরস্পরকে আরো কিছুটা চিনে ওঠা এবং জীবনের অন্যান্য টুকিটাকি কথা নন্দনের সাথে চালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে ‘আপনি’ থেকে দুজনে ‘তুমি’ তে চলে আসে। নন্দন যে এসবে বিরক্ত তার কোনো প্রকাশ চিহ্ন ইলোরার কাছে ধরা পড়ে না। তবু একটা প্রসঙ্গ শেষ হলে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার মাঝামাঝি বিরতিতে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে সে বিরক্ত হচ্ছে কিনা। নন্দনের তাৎক্ষণিক উত্তর ইলোরাকে কথা চালিয়ে যেতে আরো উৎসাহিত করে। এভাবে কখন যে তিন ঘন্টা পেরিয়ে গেছে দুজনের কেউ-ই তা টের পায়নি। অবশেষে ইলোরাই সেদিনের মতো ফোনে বিরতি চেয়ে নেয়। কারণ অন্য নদের জোয়ারে ভাসার সময় হয়ে এসেছে তার। আর এর জন্য সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যদিও এখনো পুরোপুরি ইচ্ছাবদ্ধ নয়।

অন্য নদে সে আজীবন সাঁতার কাটতে চায়নি কখনো। কিন্তু সবই যেন ঘটে গেল সহসাই। আর মানুষের জীবনে একবার যা ঘটে যায় তাকে ফিরিয়ে আনে সাধ্য কার? ঘটে যাওয়া ঘটনা যে ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় তারই চক্রে ঘুরপাক খেতে হয়, অন্তত যতদিন সে ঘটনার পাত্র-পাত্রী চুক্তিবদ্ধ থাকে কিংবা এর প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে।

নদের প্রত্যক্ষ জোয়ারে ভেসেছে ও সাঁতার কেটেছে ইলোরা। প্রথম যখন তার সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো তখন থেকে দু’মাস। এরপর নদ ইলোরার থেকে দূরদেশে যেখানে তার জীবন ও জীবিকা চলে সেখানে ফিরে যায়। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইলোরাকে তখন সাথে নেওয়া সম্ভব ছিল না অভিবাসন প্রক্রিয়ার কিছু জটিলতার কারণে। চলে যাবার সময় নদ শুধু বলেছিল, ‘এই তো একটা বছর মাত্র! তাছাড়া আমি তো আসব মাঝে মাঝে’। কিন্তু নদের সাথে নতুন জীবনের দু’মাসের অভ্যস্ততায় ইলোরার কাঙ্খিত বাসনারা নিয়মিতভাবে সাঁতরাতে চায়।

জোয়ারে ভাসার এই অভ্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতি এবং তার কারণে পুরানো প্রচ্ছন্ন কামনার উদ্ভাস ইলোরাকে আজ নতুন করে জাগিয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে একাকীত্বও এতে ইন্ধন যুগিয়েছে, যদিও নদের সাথে নিয়মিত ফোনালাপ হয়। আবার হয়ত দুজন দুজনার সাথে নতুন জীবনের খাপ খাওয়াতে গিয়ে যে কিছুটা মান-অভিমান ও ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে তারও প্রভাব রয়েছে।

রাত গভীর হয়। প্রতি রাতের মতো আজকেও নদের ফোন আসে। খুনসুঁটি, রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান, প্রেম-প্রণয় নদের সাথে সবকিছু এখন ঐ বায়বীয় মাধ্যমেই হয়। তাও চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বড় জোর দুই তিন ঘন্টা। তারপর ইলোরা যেন আবার একা হয়ে পড়ে। প্রেমের মন জাগলে তাকে আবার ঘুম পাড়ানোর জন্য মনের মানুষের প্রয়োজন হয়। যদি সে দূরে থাকে তবে তার ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট পূর্ব প্রেম পুঁজি হিসেবে রাখতে হয়। কিন্তু নদের সাথে দায়িত্ববোধ যতটা বেশি প্রেমবোধ ততটা হয়ে ওঠেনি এখনো। দেহের মানুষ হয়েছে, তবে মনের মানুষ এখনো পুরোপুরি হয়নি। হয়ত তাই ইলোরা তার আগের ভাল লাগার গলি দিয়ে হাঁটতে চায়। সে বোঝে এতে ঝুঁকি আছে, তবু সব মিলিয়ে তার উপায় নেই এখন। অথবা সব মিলিয়ে শেষ সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চায় সে।

পরের দিন শেষ বিকেলে ইলোরার কিছু করার থাকে না। লোকজনের কোলাহলে এ সময়টাতেও ঢাকা শহরে নির্জনতা বলতে এখন কোথাও কিছু নেই যেন। নির্জনতার জাঁকালো বসবাস এখন শুধু তার মন জুড়ে। তার বেশ ইচ্ছে করে নন্দনের সাথে কথা বলার। মুঠোবার্তাও পাঠায় তার অবসর আছে কিনা এই বলে। কিছুক্ষণ পর উত্তর আসে ‘আছে’। তখন ইলোরা ফোন দেয়। দু’জনার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত বেশ কিছু পূ্র্ব ঘটনার কথা বিনিময় হয়। ইলোরাই বলে বেশি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ইলোরা এক পর্যায়ে নন্দনকে জানায় তার জীবনে নদের সাথে ঘটনাটা না ঘটলে সে নন্দনকেই তার জীবনসঙ্গী করত। নন্দন তখন রাজি না হলে জোর করেই সে তা করত। এটা শুনে নন্দন তখন মুচকি হেসে বলে, ‘তোমার এত দুঃসাহস!’ ইলোরা জবাবে বলে, ‘দুঃসাহসের দেখছ কী? এটা তো নমুনা শোনালাম’। এতে যে নন্দন আহত হয় তা নয়। মনে মনে শুধু প্রতিধ্বনি তোলে- ওরে বাপরে! সত্যি দুঃসাহসী মেয়ে! এরপর রাতের খাবারের সময় হয়ে এলে ইলোরা নন্দনকে খাওয়া সারতে বলে ফোন রেখে দেয়।

এভাবে কথা বলার পর ইলোরা নন্দনের সাথে এখন আগের চেয়ে অনেকটা সহজ ও সাবলীল হয়ে যায়। তবে নন্দনের মধ্যে মনের এত চড়াই-উৎড়াই দেখতে পায় না সে। শুধুই যেন একরৈখিক সমুদ্রতট। ঢেউ আছড়ে পড়লে তবেই শুধু ভিজতে চায়, খেলতে চায়। নিজের গরজে ঢেউয়ের কাছে যাওয়ার ক্ষমতা বা সাহস নেই। তা সত্ত্বেও নন্দনকে কথা বলার শুরু থেকেই সহজ ও সাবলীল বলে মনে হয় তার। আবার ভাবে নন্দন এগিয়ে আসবেই বা কেন? সবকিছুর মূলে তো সে নিজে। সে যদি হয় ‘ইচ্ছা’, নন্দন তবে সে ইচ্ছা পূরণের ‘সোনার কাঠি’। যে কাঠির কামনা করে, তাকেই তো তা নাড়াতে হবে।

রাত আবারো গভীর হয়। এতক্ষণে নদের সাথে ফোনালাপ শেষ করে বিছানায় গা এলিয়ে আছে সে। ঘুম আসছে না দু’চোখে। নন্দনকে মনে পড়ে। দ্বিধায় ভোগে সে জেগে আছে নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখি না একটা ছোট্ট করে বার্তা পাঠিয়ে। পাঁচ মিনিট হয়ে যাওয়ার পরও যখন কোনো ফিরতি বার্তা আসে না, তখন ইলোরা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে নন্দন নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমহীন চোখে তখন সে জানালা খুলে মুক্তহস্তে জোছনা বিলানো গভীর রাতের চাঁদের সাথে নিজ মনে কথা বলে। অন্ধকারের গভীর গহ্বর থেকে মাঝে মাঝে প্রতিধ্বনিত হয় মধ্যরাতের কুকুরের টানা টানা স্বরে কর্ণবিদারী ঘেউ ঘেউ। সে শব্দে রাতের নির্জন অন্ধকারের দেয়ালে ফাটল ধরে। আচ্ছা, গভীর রাতে এরা এমন করে ডাকে কেন? নির্জনতায় শব্দ ফোটে, নাকি শব্দে নির্জনতা ফাটে? হয়ত দুটোই।

এমন ঘোরের মধ্য থেকেই ইলোরা কখন যেন নন্দনকে ফোন করে। তখনো কোনো উত্তর নেই। ফোন দেয়ার পর তার ঘোর কেটে যায়। ভাবে বেচারা ঘুমের দেশে শান্তিতে আছে। শুধু শুধু তার আরামের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছি। এবার ইলোরার ফোন বেজে ওঠে। মনে মনে খুশি হয় সে। শব্দ শুনেই বুঝে যায় এটা নন্দনের কাজ। কারণ তার জন্য সে ‘তুমি রবে নীরবে’ গানটা রিংটোন দিয়ে রেখেছে। ফোন ধরেই ক্ষমা চেয়ে নেয় ঘুম নষ্ট করার জন্য। নন্দন বলে সেও জেগেছিল। কালকের জন্য একটা অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করছিল। এখন প্রায় শেষ। বাকিটা কালকে ক্লাসের বিরতিতে শেষ করবে। ইলোরা ভাবে নন্দন বুঝি ভদ্রতা করে এসব বলছে। কথা বলার ইচ্ছা মাটি পুঁতে রেখে সে বলে—ঠিক আছে, তুমি ঘুমাও। কালকে তো আবার সকালে উঠতে হবে তোমার। সত্যি হলেও নন্দন তা চেপে গিয়ে জানায়—কোনো সমস্যা নেই তার। কিন্তু ইলোরা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, আর নিজ থেকেই বলে তার ঘুম পেয়েছে। কালকে কথা হবে।

রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়। অন্ধকারে জোছনার পূর্ণ ঝিকিমিকি ফুটে ওঠে। ইলোরা আবার ফোনটা হাতে নেয়। আত্মবিশ্বাস নিয়ে বার্তা লেখা শুরু করে—তোমাকে সত্যি আমার খুব ভাল লাগে। কিছু মনে কোরো না। তোমার গালে যদি একটা চুমু দিতে পারতাম! এ বার্তা পাঠাবে কিনা এ দ্বিধা এখন কেন জানি কাজ করছে না তার ভেতর। হঠকারীভাবে, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও আশাব্যঞ্জকভাবে পাঠায়। এক মিনিট পর ফিরতি বার্তা আসে—এ তো আমার সৌভাগ্য যে, কোনো এক মেয়ে ভালবেসে আমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। ভালবাসার দান যা-ই হোক, তাকে উপেক্ষা করতে নেই। দু’হাত পেতে সানন্দে নিতে হয়। যারা তা নিতে জানে না, তাদের মতো অভাগা জগতে মনে হয় আর দ্বিতীয়টি নেই। আর যারা তা দিতে জানে ঠিক মানুষকে, তারা অবশ্যই তা ফেরত পায় এক সময়। ইলোরা অনেকটা অস্থির হয়ে তৎক্ষণাৎ জানায়—কালকে কি সময় হবে তোমার? নন্দন উত্তর পাঠায়—বিকেলে পারব। ইলোরা তখন ইচ্ছেপূরণের আশ্বাসে খুশি হয়ে ওঠে এবং ধন্যবাদ জানিয়ে ঘুমানোর জন্য বিদায় নেয়।

ইলোরা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাতে পারে না। আগামীকালের সম্ভাব্য ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু সময় কাটে কল্পনার আনন্দময় উত্তেজনায়। সে যে এখনো জেগে আছে তা সারা শহর তো দূরের কথা, এ বাসারও কেউ জানে না। শুধু জানে তার দু’চোখ, সমস্ত দেহ, রক্ত ও মন। একেবারে শেষ রাতে যখন সে কল্পনার চোখে দেখতে দেখতে প্রায় অবশ হয়ে পড়ে, তখনই কেবল তার ক্লান্ত চোখ দুটি সে সুযোগ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

দুপুর বারোটায় ঘুম থেকে উঠে ইলোরা ফোনে নন্দনের সাথে এক পার্কে দেখা করার বার্তা পায়। শুধু উত্তর পাঠায়—ঠিক সময় পৌঁছাব। অনেক ধন্যবাদ। তখন থেকে সকল কাজে অপেক্ষার প্রহর গোণে কাঙ্খিত ক্ষণটুকুর জন্য। আবার মনে কিছুটা ভাবনা জাগে কাজটা কি ঠিক হচ্ছে। এ দ্বিধা পিছুটান হিসেবে কাজ করলেও প্রাধান্য বিস্তার করতে পারছে না তার মনে। দুপুর এখন উপুড় হয়ে রোদ্দুর ছড়াচ্ছে। আর ইলোরা এ ঘর থেকে ও ঘর, টিভি থেকে জানালা, দরজা থেকে বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। এক মুহূর্তে ভাবছে সে যাবে না, গেলেও শুধু দেখা করবে। পর মুহূর্তে এ ভাবনা থেকে সরে আসছে। দুপুর যতই গড়ায় ততই সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। বিকেল হলে সে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে।

পার্কের এক বেঞ্চিতে নন্দনকে বসা অবস্থায় দেখতে পায় সে। বুকে দুরু দুরু কাঁপুনি নিয়ে কাছে যায়। ঘটনাক্রমে নন্দনও পাশ ফিরে তাকালে ইলোরাকে কেমন একটু জবুথবু ও আড়ষ্ট দেখতে পায়। তার পাশে তাকে বসতে বলে। ইলোরা নিচের দিকে তাকিয়ে বসে পড়ে। মনের মধ্যে উঠছে শুধু উথাল-পাথাল ঢেউ। এর মাঝে এক-দুই পলক নন্দনকে দেখে নিলেও এক নাগাড়ে দেখার সাবলীলতা যেন হারিয়ে ফেলে। নন্দন ব্যাপারটা কিছুটা মনে হয় বোঝে। আর সেটা যাচাই করতে বুদ্ধি খাটিয়ে এখানে আসার উদ্দেশ্যকে মনে করিয়ে দেয় এই বলে—কী! চুমু খাবে না? এতেই যেন কাজ হয়ে যায়। ইলোরা মুহূর্তকাল দেরি না করে এবং কোনো দিকে না তাকিয়ে নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরে নন্দনকে। যেন এমন অনুমতির অপেক্ষায় ছিল সে এতক্ষণ। যেন গাছে আম এমনভাবে পেকে ছিল যে সামান্য বাতাসে তা টুপ করে ঝরে পড়ল। তাই সারা জীবনের কাঙ্খিত এই প্রাপ্তিকে নিঃসঙ্কোচে এক নিঃশ্বাসে ভেতরে নিয়ে সে নিজের করে রাখতে চায়। নন্দনের ঠোঁটে সুদীর্ঘ চুম্বনে নিজেকে তালাবদ্ধ করে রাখে। নন্দন যখন তালা খোলে, তখনই কেবল ইলোরাকে কিছুটা ক্ষান্ত দেখায়। আশপাশে তাকিয়ে পরিবেশ সমর্থন করলে নন্দন আবার শুরু করে। ইলোরা আবার মন নিংড়ানো মাধুরী মিশিয়ে চুমুবদ্ধ করে রাখে তার মুখ-গহ্বর। মুহূর্তেই দুজনের রক্ত সঞ্চালন বহুগুণে বেড়ে যায়। হৃৎপিণ্ডের ধুক ধুক আরো বৃদ্ধি পায়। উম্মত্ত অধীর মদিরতায় ব্যস্ত যেন দুটি শরীর ও মন। কিন্তু তাদের অন্তত এ জ্ঞানটুকু থাকে যে, তারা এখন নিরাপদ কোনো জায়গায় নেই। তারা চায় পূর্ণ নির্জনতা যেখানে দুজন ছাড়া আর কোনো পশুপাখিও থাকবে না। নন্দন এ অবস্থায় তার বাসায় যেতে প্রস্তাব করে। ইলোরা এক বাক্যে রাজি হয়ে যায়।

যেতে যেতে ইলোরার মনে এতক্ষণের ভাব জারিত রস অনেকটা উবে যায়। সামাজিক চেতনা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে তার মাথার মধ্যে যখন তারা দুজনেই নন্দনের বাসায় পৌঁছে যায়। দ্বিধাগ্রস্ততা আবার উঁকি মারে ইলোরার মনে—যদি আরো বেশি কিছু হয়। ফলে তার পা দুটি যেন একটু পিছে সরে যায়। নন্দন খেয়াল করে ইলোরা তার কয়েক কদম পিছনে পড়ে আছে। তাই প্রেমের এমন আদুরে আহ্বান করে ইলোরার পক্ষে যা উপেক্ষা করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। সব চেতনাই বুঝি প্রেম চেতনার কাছে এভাবে কুর্ণিশ করে হার মানে।

নন্দন বোধ হয় জানে সে কী করতে যাচ্ছে বা কী ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ইলোরা নিজের মধ্যে এখনো বিভক্ত। যদিও বিভক্তকারী রেখাটি সরু, তবু বেশ প্যাঁচানো। এমন নির্জন, নিরাপদ পরিবেশ প্রেমকেই শক্তিশালী করে জাগিয়ে তোলে। চোখে মদিরতা নিয়ে নন্দনই এবার ইলোরার ঠোঁটে প্রথমে উষ্ণতা সঞ্চার করে। সেও যথারীতি তার সাড়া দেয়। আগের চেয়েও যা তীব্র, আদিম ও রুদ্র। এর পরিণতিতে নন্দনের ছোঁয়ায় ইলোরার উষ্ণ বৃত্তদ্বয় আরো উষ্ণ হয়ে ওঠে। নন্দনের ভেতরে ডুবে থাকার তীব্র আকাঙ্খা জাগে ইলোরার। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড ঠোঁটের উষ্ণতা বিনিময়েই সীমাবদ্ধ থাকে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর নন্দন যখন দেখে ইলোরা এর চেয়ে বেশি অগ্রসর হচ্ছে না, তখন সে নিজেই তার মধ্য নদীতে ডুবে যেতে সাঁতরাতে উদ্যত হয়। মুহূর্তেই তা বুঝে ফেলে ইলোরা। ইলোরারও ডুবে যাবার তীব্র বাসনা সত্ত্বেও মনে হয় সামাজিক চেতনা কিংবা নদের প্রতি প্রতিশ্রুতি বাধ সাধে। তাই সে আপত্তি করে। প্রেমিক পুরুষ বলেই নন্দন শেষ বারের মতো চেষ্টা করে। আবার বাধা এলে সে আর অগ্রসর হয় না। মনে হয় বাসনা পূরণে ব্যর্থতার হতাশা তাকে গিলে ফেলে, কিন্তু জোর করে না। নিজেকে সরিয়ে নেয় ইলোরার কাছ থেকে। এরপর চিৎ হয়ে শুয়ে ইলোরার অস্বীকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করে।

ইলোরা জেগেছে এবং জাগিয়েছে সত্যি। জাগিয়েছে বলেই নন্দন এমন উম্মত্ত হয়ে ওঠে। আর জেগেছে বলেই নিজে এখনো ক্ষান্ত হতে পারছে না। প্রেমের শেষ তৃপ্তি হিসেবে নন্দনের বুকে শুয়ে থাকে কিছুই না করে। নন্দনও তাকে নির্বিকার বুকে রেখে দেয় যতক্ষণ সে থাকতে চায়। নির্জীব শুয়ে ইলোরা ভাবে এর বেশি কিছু করা ঠিক না। কোন ঘোর তাকে এখানে এনেছে? কেন এবং কীভাবে সে এখানে এল? সে শুধু শুয়ে আছে কামনার তীব্রতা কমানোর জন্য। ওঠার ক্ষমতা নেই, কিন্তু অন্য কিছু না করার বোধও যেন প্রবল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে এক সময় নন্দন বলে ওঠে—শুইলে ভালভাবে শুয়ে পড়ো। ইলোরা বুকের উপরে শুয়ে থেকেই ভেজা কন্ঠে শুধু জবাব দেয়—এই বেশ!





Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*