কথাসাহিত্যের শিল্পরূপ: তালিকাপুঞ্জ

অনুবাদ




কথাসাহিত্যের শিল্পরূপ

মূল: ড্যাভিড লজ

অনুবাদ: শাহীনুর ইসলাম


তালিকাপুঞ্জ


নিকোলের সাহায্যে তার টাকা দিয়ে রোজমেরি দুটি পোশাক ও দুটি হ্যাট ও চার জোড়া জুতা কিনলো। দুই পৃষ্ঠা জুড়ে বিরাট একটা তালিকা দেখে নিকোল কিনলো, আর জানালাগুলোর জিনিসপত্র কিনলো। যা কিছু তার পছন্দ হলো যা সম্ভবত সে নিজে ব্যবহার করতে পারতো না, বন্ধুকে উপহার হিসেবে দেয়ার জন্য সে সেসব কিনলো। রঙিন তসবি, ভাঁজ করা বীচ কুশন, কৃত্রিম ফুল, মধু, অতিথির বিছানা, ব্যাগ, ওড়না, লাভ বার্ড, পুতুলের বাড়ির অনুচিত্র, আর চিংড়ি মাছ রঙের নতুন তিন গজ পরিমাণ কাপড়। এক ডজন গোসলের পোশাক, একটা রাবার অ্যালিগেটর, ভ্রমণের জন্য স্বর্ণ ও আইভোরির এক সেট দাবা, অ্যাবির জন্য লিনেনের বড় রুমাল, হার্মেজ থেকে মাছরাঙা নীল ও জ্বলন্ত ঝোঁপের দুটি ক্যামিও চামড়ার জ্যাকেট — সব কিছু কিনলো উচ্চ শ্রেণীর রাজগণিকার অন্তর্বাস ও রত্নাদি কেনার মতো করে নয়, মোটের উপর যা ছিলো পেশামূলক প্রস্তুতি ও বীমা, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। নিকোল ছিলো অনেক বুদ্ধি ও পরিশ্রমের ফসল। তার জন্য ট্রেন শিকাগোতে চলা শুরু করলো এবং মহাদেশটির গোল পেট অতিক্রম করে ক্যালিফোর্নিয়ায় গেলো; শিকল ফ্যাক্টরিগুলো ধূমায়িত হলো এবং লিঙ্ক বেল্টগুলো একটার পর একটা সংযুক্ত হলো; মানুষগুলো বিরাট পাত্রে টুথপেস্ট মেশালো এবং তামার পিপা থেকে মাউথওয়াশ টানলো; মেয়েরা আগস্ট মাসে দ্রুত টমেটো ক্যানজাত করলো কিংবা বড়দিনের প্রাক্কালে ফাইভ এন্ড টেনসে কঠোর কাজ করলো; অর্ধ-শংকর ভারতীয়রা ব্রাজিলিয়ান কফি চাষের জন্য পরিশ্রম করলো এবং স্বাপ্নিকদের কাছ থেকে নতুন ট্রাক্টরের পেটেন্ট স্বত্ব পেশি শক্তি খাটিয়ে নিয়ে নেওয়া হলো — এরা সেসব লোকের কেউ কেউ ছিলো যারা নিকোলকে এক দশমাংশ কর দিতো আর, যেহেতু পুরো ব্যবস্থাটা বজ্রের মতো প্রভাব   বিস্তার করেছিলো, সেহেতু পাইকারী ক্রয় হিসেবে তার এমন প্রক্রিয়ায় এটি কর্মব্যস্ত ভাব এনে দিলো, দমকল বাহিনীর লোকের মুখে তার পদ ধরে রেখে আগুন ছড়ানোর আগে সে মুখের রক্তিমাভার মতো। নিজের মধ্যে নিজের সর্বনাশ ধারণ করে সে সাধারণ নীতিগুলো উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলো, কিন্ত এত ঠিকঠাকমতো সেগুলো ব্যাখ্যা করলো যে প্রক্রিয়াটির মধ্যে সুষমা ছিলো, আর রোজমেরি এখন তা অনুকরণ করতে চেষ্টা করবে।

এফ. স্কট ফিটসজেরাল্ড  টেন্ডার ইজ দ্য নাইট (১৯৩৪)



“ধনীরা আমাদের থেকে ভিন্ন হয়,” এফ. স্কট ফিটসজেরাল্ড একবার আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে বলেছিলেন, উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “হ্যাঁ, তাদের অনেক টাকা আছে।” ফিটসজেরাল্ডের রেকর্ডকৃত এ উপাখ্যানটি সাধারণত তার বিরুদ্ধে বলা হয়। কিন্তু হেমিংওয়ের দৃষ্টবাদী (positivist) মন্তব্যে নিশ্চয়ই মূল বিষয়টি বাদ পড়ে গেছে: যে অন্যান্য বিষয়ের মতো টাকার ক্ষেত্রেও পরিমাণ আজ হোক কাল হোক গুণে পরিণত হয়, ভালর জন্য হোক আর মন্দের জন্য হোক। নিকোল ডাইভারের প্যারিসে কেনাকাটা অভিযানের যে বর্ণনা ফিটসজেরাল্ড প্রদান করেন তাতে বাকপটুতার সাথে ধনীদের পার্থক্যকে দৃষ্টান্তসহ দেখিয়ে দেন।

            এতে আরো দেখানো আছে কথাসাহিত্যের ডিসকোর্স তালিকার প্রকাশময় সম্ভাবনা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে পৃথক পৃথক জিনিসের কেবল একটা ক্যাটালগ চরিত্র ও ঘটনা কেন্দ্রিক গল্পে বেমানান প্রতীয়মান হবে। কিন্তু কথাসাহিত্যের গদ্য চমৎকারভাবে সর্বভূক, সব ধরনের ননফিকশনাল রচনাকে আত্মীকরণ করে নিতে সক্ষম — সেটা যাই হোক না কেন, চিঠি, ডায়েরি, জবানবন্দী, এমনকি তালিকা — আর নিজের উদ্দেশ্যে সেগুলোকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। মাঝে মাঝে তালিকা পুনরায় করা হয় এর নিজের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উল্লম্ব আকারে, পরিপার্শ্বের রচনার সাথে বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে। যেমন– মার্ফি  তে স্যামুয়েল বেকেট তাঁর নায়িকা, সেলিয়ার নির্ধারিত, পরিসংখ্যানগত উপায়ে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের তালিকা করে উপন্যাসের প্রথাগত বর্ণনাকে ব্যঙ্গ করেন:

                  মাথা —————————ছোট ও গোলগাল

চোখ—————————-সবুজ

গায়ের রঙ———————-সাদা

চুল——————————হলুদ

     মুখের গড়ন———————গতিময়

ঘাড়—————————–১৩”

উপরের বাহু———————১১”

সামনের বাহু———————৯”

ইত্যাদি।

 

            সমসাময়িককালের আমেরিকান লেখক, লরি মূরের “হাউ টু বী অ্যান আদার উম্যান” (সেলফহেল্প, ১৯৮৫) নামে নিজে করুন পুস্তিকা, আর তালিকা এ দুটি ননফিকশনাল ধরনের রচনা ভিত্তিক, মজার একটা গল্প আছে। প্রেমিকার ভূমিকায় কথকের নিরাপত্তাহীনতার আরো অবনতি ঘটে তার প্রেমিকের নিজের স্ত্রীর প্রশংসায়:

            “সে তো অবিশ্বাস্য রকমের গোছালো। সব কিছুর জন্য সে তালিকা করে। বেশ মনোমুগ্ধকর।”

            …

            “সে তালিকা করে? তোমার সেটা ভাল লাগে?”

            “হ্যাঁ, লাগে। তুমি তো জানো সে কী করতে যাচ্ছে, তার কী কিনতে হয়, মক্কেলদের নাম দেখতে হবে তাকে, ইত্যাদি।”

            “তালিকা?” আপনি হতাশ হয়ে নিরুদ্যম হয়ে বিড়বিড় করছেন, আপনার দামী বাদামী ক্রিম রঙের রেইনকোটটা এখনো পরে আছেন।

অবশ্য শীঘ্রই কথক তার নিজের তালিকা করে:

            মক্কেলদের দেখতে হবে

            জন্মদিনের ছবি তুলতে হবে

            স্কচ টেপ

            টিডি ও মাকে চিঠি

মামুলি একজন সেক্রেটরি হওয়ায় বস্তুত দেখা করার মতো তার কোনো মক্কেল নেই। অনুপস্থিত স্ত্রীর ভাবমূর্তির সাথে পাল্লা দেয়ার একটা উপায় এই তালিকাগুলো। তার প্রেমিক যখন ইঙ্গিত দেয় যে তার স্ত্রীর দুঃসাহসিকতামূলক যৌন জীবন রয়েছে, তখন কথক জবাব দেয়:

            এ যাবৎ তোমার যত প্রেমিক হয়েছে তাদের সবার একটা তালিকা করো।

            ওয়ারেন ল্যাশার

            ইড “রাবারহেড” ক্যাটাপ্যানো

            চার্লস ডীটস না কীটস

            অ্যালফোনজ

এটা তোমার পকেটে গুঁজে রাখো। যাতে সহজে দেখা যায় সে রকম করে ফেলে রাখো। যে কোনোভাবে হারিয়ে ফেলো। নিজের সাথে “ভুল করে ফেলে আসা” কৌতুক করো। আরেকটা তালিকা করো।



প্রধানত নারী পাঠকদের লক্ষ্য করে ধনীদের জীবন নিয়ে সমসাময়িককালে এক ধরনের জনপ্রিয় কথাসাহিত্য  রয়েছে যা প্রকাশনা বাণিজ্যের কাছে “সেক্স এন্ড শপিং” (বা কম ভদ্রভাবে “এস এন্ড এফ”) উপন্যাস হিসেবে পরিচিত। এমন উপন্যাসে থাকে নায়িকাদের বিলাস দ্রব্য কেনা থেকে শেষ ডিজাইনারের লেবেলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। যৌন ও ভোগবাদী ইচ্ছেপূরণ একই সাথে লিপ্ত থাকে। স্কট ফিটসজেরাল্ডও যৌন প্রলোভন এবং স্পষ্ট ভোগের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে লেখেন, কিন্তু তিনি অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে ও জটিলভাবে তা ফুটে তোলেন। টেন্ডার ইজ দ্য নাইট  থেকে এ প্যাসেজে তিনি নিকোলের দুই পৃষ্ঠাব্যাপী কেনাকাটার তালিকা পুনরায় প্রণয়ন করেন না, আবার তার জন্য ব্রান্ড নাম দিয়ে তার কাজ করাতেও চেষ্টা করেন না। বস্তুত, উল্লেখযোগ্য রকমের কম জিনিস নিয়ে তিনি অমিতব্যয়ীতার মুগ্ধতা সৃষ্টি করেন, আর কেবল একটি ব্রান্ড নাম উল্লেখ করেন, “হার্মেজ” (মজার ব্যাপার হলো এর কোনো তারিখ দেয়া হয়নি)। কিন্তু নিকোলের কেনাকাটার পুরোপুরি অনুপযোগবাদী প্রকৃতি জানাতে তিনি তালিকার বিবিধের উপর জোর দেন। সস্তা, রঙিন পুঁতির মতো তুচ্ছ জিনিস, মধুর মতো ঘরোয়া জিনিসের সাথে বিছানার মতো বড় কাজের জিনিস, স্বর্ণ ও আইভোরি দাবার সেটের মতো দামী খেলনা, আর রাবার অ্যালিগেটরের মতো ছ্যাবলামির নির্বিচার মিশ্রণ ঘটানো হয়। তালিকায় কোনো যৌক্তিক ক্রম, কোনো মূল্য ক্রম, বা কোনো গুরুত্ব, বা কোনো নীতি অনুযায়ী জিনিসগুলোর শ্রেণীবিভাগ নেই। সেটাই হচ্ছে বিষয়।

            নিজের সাথে আনা তালিকার চরিত্র নির্ধারক বৈশিষ্ট্য নিকোল দ্রুতই অতিক্রম করে, আর তার খেয়ালে যা আসে তা-ই কেনে। অর্থ কিংবা কাণ্ডজ্ঞানের কথা না ভেবে তার রুচির প্রয়োগ ঘটিয়ে ও খামখেয়াল মিটিয়ে সে এমন এক ব্যক্তিত্ব বোধ  ও মেজাজ ধারণ করে যা উদার, হঠকারী, আনন্দদায়ক ও নন্দনতাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল হয়, যদি কোনো কোনো  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে  বাস্তবতার সংস্পর্শে না থাকে। ব্যয়ের এ জোয়ারে মজা ও যৌন আনন্দে সাড়া  না দেওয়া অসম্ভব। সেই দুটি ক্যমিও চামড়ার জ্যাকেট কত কাঙ্খিত শোনায়, মাছরাঙা নীল ও জ্বলন্ত ঝোঁপ (কিন্তু প্রধান শব্দ হচ্ছে “দুটো”: যেখানে ভিন্ন, সমান আকর্ষণীয় রঙের দুটো একই জ্যাকেটের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম সাধারণ মানুষেরা ইতস্তত করতে পারে,  সেখানে নিকোল কাপড় কিনে সমস্যাটি সুরাহা করে)। বিস্ময়ের কিছু নেই যে তার তরুণ অনুরাগভাজন, ও ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দী, রোজমেরি তার রীতিকে অনুকরণ করার চেষ্টা করবে।

            প্রথম তালিকাটা যখন বিশেষ্যের ক্রম, অন্যদিকে দ্বিতীয়টা তখন ভার্বাল ফ্রেজের ক্রম: “ট্রেন শিকাগোতে চলা শুরু করলো… শিকল ফ্যাক্টরিগুলো ধুমায়িত হলো… মানুষজন  টুথপেস্ট মেশালো…মেয়েরা টমেটো ক্যানজাত করলো…” প্রথম দৃষ্টিতে এ প্রক্রিয়াগুলোকে নিকোলের কেনাকাটার জিনিসপত্রের মতো পারস্পরিক অসঙ্গতিপূর্ণ ও এলোপাতাড়িভাবে নির্বাচিত মনে হয়, কিন্তু টুথপেস্ট ফ্যাক্টরির মানুষগুলো এবং ডাইম দোকানের মেয়েগুলো ও ব্রাজিলের ভারতীয় কর্মীদের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে: তাদের শ্রম থেকে অর্জিত লভ্যাংশ নিকোলের কেনাকাটায় অর্থ যোগান দেয়।

            দ্বিতীয় তালিকাটা প্রথমটার চেয়ে বেশি রূপকগত রীতিতে লেখা হয়। এটা শুরু হয় চমৎকার এক চিত্রকল্প দিয়ে যা যৌনতা ও অতি ভোগের, “মহাদেশটির গোল পেট” অতিক্রম করা ট্রেনগুলোর ইঙ্গিত বহন করে, এবং বিপজ্জনক ও শিল্প পুঁজিবাদের সম্ভাবনাময় আত্মবিধ্বংসী শক্তিকে মনে করিয়ে দিতে শেষে রেলওয়ে ইঞ্জিনের রূপকে ফিরে আসে। “যেহেতু পুরো ব্যবস্থাটা বজ্রের মতো প্রভাব বিস্তার করেছিলো” এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় রেলওয়ে প্রতীকবাদের কথা যা একই প্রভাবের জন্য ব্যবহৃত হয় ডিকেন্সের ডম্বে এন্ড সান এ (“যে ক্ষমতা এর লৌহ পথে অর্পণ করা হয় — এর নিজের পথে– প্রত্যেক বিপত্তির হৃদয় বিদীর্ণ করে, আর এর পিছনে সব শ্রেণী, বয়স, ও মাত্রার জীবন্ত প্রাণীদেরকে টেনে নিয়ে সকল পথ-ঘাটকে অগ্রাহ্য করে, সে ক্ষমতা বিজয়ী দানবের, যমের জাত।”)



            অবশ্য ফিটসজেরাল্ডের বৈশিষ্ট্যমাফিক চিত্রকল্পটি অপ্রত্যাশিত ও বেশ সুদূরপরাহতভাবে বিকশিত হয়। সাদৃশ্যমূলক তুলনা রেলওয়ে ইঞ্জিনের চুল্লীর তুলনা থেকে অগ্নিকুণ্ডের তুলনায় চলে যায়, আর নিকোল এখন আগুনে ইন্ধন দেয়ার মতো অবস্থানে দাঁড়িয়ে নেই, তবে নেভানোর চেষ্টায় আছে, কিংবা অন্ততপক্ষে অগ্রাহ্য করার অবস্থানে আছে। “দমকল বাহিনীর লোক” শব্দগুলো  এসব স্ববিরোধী অর্থের উভয়কেই বহন করে, আর ফিটসজেরাল্ড কর্তৃক এর ব্যবহার সম্ভবত নিকোলের মতো মানুষদের প্রতি তাঁর নিজের দুই বিপরীত মনোভাবকে ব্যক্ত করে: ঈর্ষা ও প্রশংসা এবং অননুমোদনের মিশ্রণ। “নিজের মধ্যে নিজের সর্বনাশ ধারণ করে সে সাধারণ নীতিগুলো উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলো, কিন্ত এত ঠিকঠাকমতো সেগুলো ব্যাখ্যা করলো যে প্রক্রিয়াটির মধ্যে সুষমা ছিলো” এ শব্দগুলোকে হেমিংওয়ের সাহসের সংজ্ঞা: “চাপের মুখে সুষমা” এর সচেতন কিংবা অসচেতন প্রতিধ্বনির মতো শোনায়।


আগের পর্ব                                                                                                                                              পরের পর্ব




Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*